দুই শতাংশ সুদে ঋণ পুনঃতফসিলকারীরা বিপাকে

বিশ্বজুড়ে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের কারণে ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। আর এজন্য অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশ সরকারও বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করেছে। পাশাপাশি ব্যাংক থেকে ঋণগ্রহীতাদের জন্য বিশেষ সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কোনো ঋণগ্রহীতা ঋণ শোধ না করলেও ঋণের শ্রেণিমানে কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের কোনো কিস্তি পরিশোধ না করলেও গ্রহীতা খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হবেন না। এ সময়ের মধ্যে ঋণ/বিনিয়োগের ওপর কোনোরকম দন্ড, সুদ বা অতিরিক্ত ফি (যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন) আরোপ করা যাবে না। অর্থাৎ মার্চ, জুন এবং সেপ্টেম্বর এ তিন প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ এক টাকাও আর বাড়বে না।

তবে যারা ইতিমধ্যে ২ শতাংশ সুদে ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা নিয়েছেন তারা এ প্রণোদনার কোন সুবিধা পাচ্ছেন না। অথচ এসব ঋণগ্রহীতারা এমনিতেই ঋণের ভারে নুহ্য। ব্যবসার খারাপ অবস্থার মধ্যেও নীরব ঘাতক খেলাপি ঋণ দূরীকরণে সরকারের ঘোষণায় ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা নিয়েছেন অনেকেই। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে অবদান রেখে যারা নানামুখী সমস্যায় পড়ে খেলাপি হয়েছেন তারা আবার স্বাভাবিক ব্যবসায় ফেরার সাহস যোগাচ্ছেন। কিন্তু সুবিধার আওতায় আসার পর থেকেই করোনার থাবা পড়েছে তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও। এমন পরিস্থিতিতে তাদের ব্যবসা চালিয়ে রাখাটাই কষ্টকর। সেক্ষেত্রে সরকারের কাছে তাদেরকে আরো কিছু সহযোগিতার জন্য দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে অন্যান্য ঋণগহীতাদের মতো ডিসেম্বর পর্যন্ত দেয়া সরকারের সুযোগ তাদের জন্য বলবৎ রাখার দাবী জানিয়েছেন অনেকে।
বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, করোনায় দেশের সবারই ব্যবসা-বাণিজ্যে বিপর্যয় নেমে এসেছে। তাই সবার জন্যই সমান সুযোগ দেয়া উচিত।

অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও শামসুল ইসলাম বলেন, ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কোনো ঋণগ্রহীতা ঋণ শোধ না করলেও ঋণের শ্রেণিমানে কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা রয়েছে। মহামারী করোনায় সব খাতই মন্দায় পড়েছে। তাই সবার জন্যই একই সুবিধা হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে নির্দেশনা অনুযায়ীই সবাই এই সুযোগ পাবেন।

সূত্র মতে, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে এবং অর্থনীতিকে গতিশীল করতে গত বছরের ১৬ মে ঋণ পুনঃতফসিল ও এককালীন পরিশোধ সংক্রান্ত বিশেষ নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আওতায় ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট বা এককালীন জমার বিপরীতে ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিল করার সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু এই সার্কুলার জারির পর পরই এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে রিট করা হয়। রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট সার্কুলারকে স্থগিতাদেশ দেয়। পাশাপাশি হাইকোর্টের এই আদেশকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এই মর্মে রুল জারি করা হয়। এতে অনেকটা সময় ক্ষেপন হয়।

পরে ২৪ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সার্কুলার অনুযায়ী, বিশেষ নীতিমালার আওতায় খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের গৃহীত আবেদন নিষ্পত্তির জন্য এক মাস সময় পেয়েছিল দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলো। পুনঃতফসিলের জন্য ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত নিষ্পত্তি করার সময় বৃদ্ধি করা হয়। তবে সে সময়ে নানা জটিলতায় ব্যাংকগুলো নতুন কোনো আবেদন গ্রহণ করতে পারেনি। পরে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকারের নেয়া বিশেষ সুবিধা সংক্রান্ত এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে হাইকোর্ট ওই সার্কুলারের মেয়াদ আরো ৯০ দিন বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নির্দেশ দেয়। কিন্তু ৯০ দিন সময়ের শেষ দিকে দেশে করোনার প্রকোপ দেখা দেয়ায় অনেকেই মহামারি থেকে বাঁচতে এই সুযোগের আওতায় আসতে পারেননি। তাদের দাবি, করোনার কারণে যারা এই সুবিধার আওতায় আসতে পারেননি তাদেরকে সুযোগ দেয়ার জন্য সময় বাড়িয়ে দেয়া দরকার।

সূত্র মতে, চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশের ব্যবসাখাতে মন্দাভাব দেখা যায়। এরই মধ্যে হঠাৎ করোনাভাইরাসের মহামারিতে বিশ্ব কেঁপে উঠে। প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের আমদানি-রফতানিতেও। এমন পরিস্থিতিতে দেশ একপ্রকার অচল অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্টে ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ নিয়ে গত বছর (২০১৯) রেকর্ড ৫২ হাজার ৭৬৭ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে নিয়মিত করেছে পুরো ব্যাংক খাত। সরকারের সমযোপযোগী এ সিদ্ধান্ত অর্থনীতিকে অনেকটা গতিশীল করেছে।

এদিকে, করোনার কারণে গত মার্চ মাস থেকে ব্যবসা একেবারেই বন্ধ। বর্তমানে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও সামনে রয়েছে করোনা দ্বিতীয় ধাপের আশঙ্কা। এমন পরিস্থিতিতে সরকার সব ক্ষেত্রেই প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করেছে। তবে এসব সুবিধা খেলাপিরা পাবেন না বলেও অনেক সময় বলা হচ্ছে। তাই দেশের এমন পরিস্থিতিতে বিশেষ সুবিধা পাওয়া খেলাপিরা সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আতাউর রহমান প্রধান পিপলস টিভিকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার বাইরে গিয়ে কিছু করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি ২ শতাংশ সুদে ঋণ পুনঃতফসিলকারীদের অন্যদের মতো সুযোগ দেয় আমরা তা পালন করবো।