রাজনৈতিক ধর্মের লাগাম টানবে কে?

||নিয়ন মতিয়ুল||
বিশ্বাস আর আবেগনির্ভর ধর্মের ‘উগ্রতা’কে সামাল দেয়ার ক্ষেত্রে সমাজের প্রচলিত সম্প্রীতিবোধ বা অসাম্প্রদায়িক চেতনা যথেষ্ট-ই সক্ষম। তবে ‘রাজনৈতিক ধর্ম’কে বুঝে ওঠা কিংবা এর ভয়াবহতাকে ঠেকানোর জন্য আমাদের সমাজমানস এখনও সেভাবে প্রস্তুত নয়। বলা যায়, সমাজমানসকে সেভাবে তৈরি করতে পারেনি আমাদের ক্ষমতামুখী রাজনীতি। যে কারণে বাস্তবিক ক্ষেত্রে একেবারেই তুচ্ছ-নগন্য ঘটনাকে দাবানলের উৎস বানিয়ে গোটা সমাজকে পুড়িয়ে দেয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কয়েক শতাব্দী ধরে উপমহাদেশে নানা ধর্ম-বর্ণ-সংস্কৃতির অপূর্ব মিথস্ক্রিয়ায় গড়ে ওঠা বাঙালি বা বাংলাদেশি সমাজে সাম্প্রদায়িক উগ্রতার বর্তমান সংস্করণের পেছনে রাজনৈতিক উদাসীনতা চরমভাবে দায়ী। বিশেষ করে ক্ষমতামুখী, জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন সমাজকে একেবারেই অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে। অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক-বাহকরাও রাজনৈতিক ধর্মকে লালন-পালন কিংবা সুরক্ষা দেয়ার মহান ব্রত গ্রহণ করেছেন।

গেল কয়েকদিনে দেশে সাম্প্রদায়িক উগ্রতার ভয়াবহ লাগামহীন চেহারার বিপরীতে রাজনৈতিক নীরবতা নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। সেইসঙ্গে গণমাধ্যমের অতিরিক্ত সতর্কতামূলক ভূমিকার বিপরীতে সামাজিক মাধ্যমে প্রবল প্রতিক্রিয়া নিয়েও চলছে আলোচনা-সমালোচনা। ঘটনার পেছনে বিদেশি গোয়েন্দাদের হাত কিংবা দেশীয় বিরোধীরাজনৈতিক শক্তির ষড়যন্ত্র আবিষ্কারের প্রথাগত প্রচেষ্টাও অনেক ক্ষেত্রে কৌতুহল কিংবা বিরক্তির জন্ম দিচ্ছে।

দেশকে ধনী কিংবা বড় অর্থনীতির রাষ্ট্র বানানোর পাশাপাশি নিজেদের অনুকূলে উদার, উন্নত, অসাম্প্রদায়িক চেতনার সামাজিক মগজ তৈরি করাও যে জরুরি সেটা কি মেগাপরিকল্পনার মধ্যে রাখা হয়েছে? নীতি-নির্ধারক কিংবা বুদ্ধিবিক্রেতারা কি ভেবেছেন তিন বেলা ভরপেট খেয়ে সন্তান উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জনই সমৃদ্ধ বাংলা গড়ার একমাত্র শর্ত?

রাজনীতিকরা কি জানেন না, ধর্মীয় অনুভূতিকে রাজনীতির টুলস বানিয়ে সাময়িকভাবে সফল হওয়া যায় সত্য, তবে রাজনৈতিক ধর্মের ফ্রাংকেনস্টাইন থেকে সারাজীবন পালিয়ে বেড়াতে হয়। পরিবর্তিত বিশ্বে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতে দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা বাংলাদেশের সামনে অনেক সম্ভাবনা সত্ত্বেও শুধুমাত্র রাজনৈতিক ধর্মই এদেশের সমাজমানস, বিশেষত তরুণ প্রজন্মকে পঙ্গু করে দিতে পারে। নিরীহ জনগোষ্ঠীর হাহাকার আর রক্তঝরার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

সমৃদ্ধ বাংলা গড়ার পাশাপাশি তাই সবার আগে রাজনৈতিক ভণ্ডামি, অন্ধবিশ্বাস, শিক্ষা, সংস্কৃতির বদল ঘটিয়ে রাজনৈতিক ধর্মের লাগাম টানা জরুরি। না হলে শুধু কুমিল্লা থেকে পীরগঞ্জ-ই পুড়বে না, সাম্প্রদায়িক বিষ অকেজো করে দেবে গোটা সমাজমানস। উন্নয়নের রাজনীতির প্রতিও আগ্রহ হারাবে মানুষ।

(লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক, কলাম লেখক)  ছবি : পীরগঞ্জ