অনুমতির মারপ্যাঁচে ব্যাহত আমদানি-রপ্তানি

ভুটান থেকে বাংলাদেশে সড়কপথে বুড়িমারী স্থলবন্দর এবং নকুগাঁওয়ের অংশ দিয়ে পণ্য পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে। এতে ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের রপ্তানি ও আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। এর মূল কারণ সড়কপথে ট্রাকে পণ্য পরিবহনে অনুমতির জটিলতা। এ জন্য সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে বৈঠক হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, এনবিআরসহ সংশ্লিষ্টদের সমাধানের পথ তৈরি করতে বলা হয়েছে। এর পর তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

জানা গেছে, ভুটানের পণ্যবাহী ট্রাক ভারতের চেংড়াবান্ধা বন্দর দিয়ে বাংলাদেশের বুড়িমারী স্থলবন্দরে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশি রপ্তানি পণ্যবাহী ট্রাক ভারতের ভূমি ব্যবহার করে ভুটানের ফুন্টসিলিং পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি নেই। বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা বুড়িমারী স্থলবন্দরে রপ্তানি পণ্য খালাস করেন। ভুটানের খালি ট্রাক ওই পণ্য নিয়ে যায়।

ভারতের চেংড়াবান্ধা বন্দর কর্তৃপক্ষ ভুটানের ট্রাকগুলোকে দুপুর ২টার পর বাংলাদেশের বুড়িমারী স্থলবন্দরে প্রবেশের অনুমতি দেয়। ফলে মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে ভুটানের ট্রাকগুলোর পক্ষে বুড়িমারী স্থলবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ভুটানে ফিরে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে সমাধান করা এবং বিবিআইএন- মোটর ভেহিক্যাল এগ্রিমেন্ট এ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান।

এদিকে বুড়িমারীর মতো নাকুগাঁও স্থলবন্দরেও সমস্যা রয়েছে। এ বন্দরের মাধ্যমে শুধু পাথর ও কয়লা আমদানি হয়। একইভাবে সব পণ্য রপ্তানির সুযোগ থাকলেও শুধু সিমেন্ট, শাড়ি, গার্মেন্ট সামগ্রী, মশারির কাপড় ইত্যাদি রপ্তানি হয়ে থাকে। ফলে নাকুগাঁও স্থলবন্দরের বিদ্যমান অবকাঠামোর বেশিরভাগই অব্যবহৃত। বন্দরটি অধিক কার্যকর করতে ভুটানের গেলুপ পর্যন্ত একটি ত্রিপক্ষীয় ক্রস বর্ডার রুট স্থাপন করা জরুরি। এতে আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধির পাশাপাশি নেপাল ও ভুটানের বাণিজ্য সহযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, বুড়িমারী স্থলবন্দরে কাস্টমস ও নিরাপত্তাবিষয়ক কার‌্যাবলির জন্য ভুটানের ট্রাককে বাংলাদেশে প্রবেশের আগে ভারতীয় অংশে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় বলে মনে করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ভারতীয় কাস্টমস কর্মকর্তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিলে সমস্যা থাকবে না। তা ছাড়া ভারতীয় স্থানীয় এজেন্টদের শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারণে বাংলাদেশের বুড়িমারী অংশে ভুটানের ট্রাক প্রবেশের গতি ধীর হয়ে যায়। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভুটানের ট্রাক বাংলাদেশে ঢুকতে প্রায়ই ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে নকুগাঁও এর মেঘালয় ডলু অংশ দিয়ে আমদানি-রপ্তানিতে অতিরিক্ত অনানুষ্ঠানিক ব্যয় হয়। এতে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। মেঘালয়ভিত্তিক কিছু এনজিও রয়েছে যারা ওই পথে ভুটান থেকে বাংলাদেশে কার্গো পরিবহনে বাধা দেয়। তাই আমদানি-রপ্তানিকারকরা এ পয়েন্ট পরিহার করে ঘোরপথে পণ্য পরিবহন করে থাকে বলে মনে করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

১৫ মার্চ অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ হচ্ছে- বুড়িমারী স্থলবন্দরের বিষয়ে ভারতীয় অংশে ভুটানের জন্য আলাদা কাস্টমস কর্মকর্তা নিয়োগ, বাংলাদেশ অংশে ভারত ও ভুটানের জন্য আলাদা দেড় কিলোমিটার ডাবল লেন সড়ক নির্মাণ, বন্দর ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের বিষয়ে ভুটানের ব্যবস্থা গ্রহণ, নকুগাঁ অংশ দিয়ে পরিবহনের ক্ষেত্রে ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাস ও বাংলাদেশের দিল্লি দূতাবাসের মাধ্যমে কূটনৈতিক যোগাযোগ। এ ছাড়া বিকল্প সড়ক স্থাপনের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ হচ্ছে- চিলাহাটি-হলদিবাড়ি দিয়ে রেলপথ স্থাপন, ভুটানের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতকৃত ট্রানজিট প্রটোকলে বিষয়টি অন্তর্ভুক্তকরণ, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথ ব্যবহার করে ভুটান কর্তৃক পণ্য পরিবহনের চলমান কার্যক্রমের গড়ি বাড়ানো। তা ছাড়া আখাউড়া-আগরতলাকে একটি নতুন ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে বলা হয়েছে।

বন্দর দুটি দিয়ে পণ্য পরিবহনের সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ-ভারত এবং বাংলাদেশ-ভুটান জয়েন্ট গ্রুপ অব কাস্টমসের সভায় বিষয়টি উত্থাপনের সুপারিশ করেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মেজবাহউদ্দিন আহমেদ।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব নজরুল ইসলামের মত হচ্ছে- বুড়িমারী স্থলবন্দর থেকে ১.৮৫ কিলোমিটার চার লেনের সড়ক করে দেওয়া যাবে। সাউথ এশিয়ান সাব-রিজিওনাল ইকোনমিক কোঅপারেশন-২ প্রকল্পের আওতায় রংপুর থেকে বুড়িমারী স্থলবন্দর পর্যন্ত চার লেন সড়কের কাজ শেষ হলে এ সমস্যারও সমাধান হবে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব সেলিম রেজার মন্তব্য হচ্ছে- দুটি রুটে ভুটানে ট্রানজিট ট্রাফিক পরিবহন করা যাবে। এর মধ্যে একটি হলো চিলাহাটি (বাংলাদেশ)-হলদিবাড়ী (ভারত)। এ রুট ব্যবহার করে বাংলাদেশের মোংলা বন্দর বা অন্য কোনো ব্রডগেজ সেকশন থেকে ভুটান সংলগ্ন ভারতীয় রেলস্টেশন হাসিমারাতে পাঠানো যাবে। আরেকটি রুট হলো- বুড়িমারী-চেংড়াবান্ধা। এ রুট ব্যবহারের মাধ্যমে ভারত ও ভুটান থেকে ব্রডগেজ ওয়াগনযোগে মালামাল এনে বুড়িমারী স্টেশনে মিটারগেজ ওয়াগনে স্থানান্তর করে রেলের বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো যাবে। তবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারতের উভয় অংশের মিসিং লিঙ্ক সংস্কার করতে হবে। এ জন্য ভারত ও ভুটানের সঙ্গে একটি ত্রিপক্ষীয় প্রটোকল দরকার।